1. admin@bornomala71.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
ভাইয়ের অসুস্থতার খবর শুনে বোনের মৃত্যু কেশবপুরে বসতবাড়িতে গ্যাসবাহী ট্যাংকার অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেল ঘুমন্ত পরিবার কেশবপুরে দুই মন্দিরে চুরি জনগণের সম্পদ জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে,অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে- এমপি আজিজুল বারী হেলাল হেরোইন মামলায় বেনাপোলের মহাসিনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের সমাপনী দিনে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবগঠিত এডহক কমিটির সভাপতি হলেন মাস্টার মকবুল হোসেন মুকুল অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতাকে জয় করে তিন মেধাবীর সাফল্য কেশবপুরে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদযাপন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেশবপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রস্তুতি সভা

অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতাকে জয় করে তিন মেধাবীর সাফল্য

  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬৯ বার পঠিত

রায়হান রনি, কেশবপুর:কারও বাবা নেই, কারও বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান, আবার কারও বাবা দিনমজুর। কারও স্কুলে যেতে হয়েছে বর্ষার পানি মাড়িয়ে, আবার কেউ প্রতিদিন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করেছে। অভাব, অনটন, জলাবদ্ধতা ও নানা প্রতিকূলতা তাদের পথের বাধা হলেও পড়াশোনার প্রতি অদম্য ইচ্ছাশক্তি থামাতে পারেনি তিন মেধাবী শিক্ষার্থীকে। কষ্টকে সঙ্গী করেই চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ ও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে কেশবপুরের গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী অভিজিৎ রায়, তানিয়া নাসরিন ও সুমি খাতুন। ভালো ফলাফলে শিক্ষক, স্বজন ও এলাকাবাসী খুশি হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে এখন তাদের পরিবারে দুশ্চিন্তা। কারণ, অর্থের অভাবে ভালো কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ চালানোই তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চায় অভিজিৎ
কেশবপুর উপজেলার গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ রায়ের জীবনটা অন্য অনেক শিক্ষার্থীর চেয়ে কঠিন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার বাবা অশোক রায়। তখন থেকেই সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মা স্বপ্না রায়ের ওপর। স্বামীকে হারানোর পর অভাব-অনটনের সংসারে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

সংসারে নানা সংকট থাকলেও অভিজিৎ পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়নি। নিয়মিত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। তার এই সাফল্যে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী আনন্দিত হলেও অভিজিৎয়ের পরিবারের আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে দুশ্চিন্তা। কারণ, ছেলেকে ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য তার বিধবা মায়ের নেই।
অভিজিৎয়ের স্বপ্ন ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়া। বিশেষ করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যেন আর কোনো পরিবারকে তার পরিবারের মতো প্রিয়জন হারানোর কষ্ট পেতে না হয় এটাই তার বড় ইচ্ছা। বাবাও স্বপ্ন দেখেছিলেন ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে চিকিৎসক বানাবেন। বাবার সেই স্বপ্নই এখন অভিজিৎয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

অভিজিৎ রায় বলে, ‘আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে লেখাপড়া করিয়ে ডাক্তার বানাবেন। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে আমার মা অনেক কষ্ট করেছেন। কিন্তু ভালো কলেজে পড়ার খরচ চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। সহযোগিতা পেলে আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।’
অভিজিৎ জানায়, তার এই সাফল্যের পেছনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম স্যার ও শাহানাজ পারভীন ম্যাডামের অনুপ্রেরণা রয়েছে। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে নিজের লক্ষ্যে অটুট ছিল।

তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে তানিয়া
তানিয়া নাসরিনের গল্পটাও সংগ্রামের। কেশবপুর উপজেলার ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের এই শিক্ষার্থী গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তার বাবা আবুল হোসেন একজন ভ্যানচালক। ভ্যান চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো পরিবারের জন্য বড় চিন্তার বিষয়।

গ্রামের অধিকাংশ এলাকা বছরের প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধ থাকে। বর্ষাকালে সেই জলাবদ্ধতা পেরিয়েই তানিয়াকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে যেতে হয়েছে। কখনো পানি মাড়িয়ে, কখনো কাদামাটির পথ পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছেছে সে। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে হার মানেনি। স্কুলে যাওয়া কিংবা পড়াশোনা কোনো কিছুই বন্ধ করেনি।

তানিয়ার স্বপ্নও চিকিৎসক হওয়া। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর তার সামনে এখন কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার পথ। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা তাকে চিন্তিত করে তুলেছে।
তানিয়া বলে, ‘আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু বাবার সামর্থ্য নেই। অন্যের সহায়তা ছাড়া আমার এই স্বপ্ন পূরণ করা কঠিন।’

২০ কিলোমিটার হেঁটে সুমির সাফল্য
অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সাফল্য পাওয়া আরেক শিক্ষার্থী সুমি খাতুন। মনিরামপুর উপজেলার বাঙালীপুর গ্রামের দিনমজুর আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সে। পাঁচ সদস্যের সংসারে তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাবাকে প্রতিনিয়ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়। অর্থাভাবে স্কুলে যাতায়াতের জন্য সাইকেল কেনা কিংবা প্রতিদিন ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের।

তাই বাধ্য হয়েই দিনের পর দিন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করেছে সুমি। প্রতিদিনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও ক্লাসে মনোযোগ দিয়েছে, বাড়িতে ফিরে পড়াশোনা করেছে। কষ্টকে কখনো অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেনি সে।
সুমি প্রথমে স্কুলসংলগ্ন বেলকাটি গ্রামে নানা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। সেখান থেকেই গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় নানা মকছেদ গাজী শিমুলগাছ থেকে পড়ে মারা যান। এরপর বাধ্য হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বাঙালীপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে হয় তাকে। কিন্তু দূরত্ব যতই হোক, সে স্কুল ছাড়েনি। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প থেকেই প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করে সুমি প্রমাণ করেছে, অর্থের অভাব মেধার পথ আটকে রাখতে পারে না। তবে এসএসসির ফল প্রকাশের পর আনন্দের পাশাপাশি নতুন দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে তার পরিবারে। কলেজে ভর্তি, বই-খাতা, যাতায়াত ও পরবর্তী পড়াশোনার খরচ কীভাবে চালানো হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সুমির স্বপ্নও চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা। কিন্তু দিনমজুর বাবার পক্ষে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে সহযোগিতা না পেলে তার দীর্ঘ সংগ্রামের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অভিজিৎ, তানিয়া ও সুমির গল্প শুধু তিন শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিবারের ত্যাগ এবং শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসার গল্প। একজন বাবাকে হারিয়েও মায়ের কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করেছে, একজন জলাবদ্ধতা পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে গেছে, আরেকজন প্রতিদিন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ হেঁটে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়েছে।
তিনজনই বিজ্ঞান বিভাগে ভালো ফলাফল করেছে এবং তিনজনেরই স্বপ্ন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল তাদের জীবনের শেষ সাফল্য নয়; বরং সামনে আরও দীর্ঘ পথ। সেই পথের সবচেয়ে বড় বাধা এখন অর্থের সংকট।

শিক্ষক, পরিবার ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা মেধাবী এই তিন শিক্ষার্থীর পাশে সমাজের বিত্তবান ও দানশীল মানুষ এগিয়ে আসবেন। অর্থের অভাবে যেন অভিজিৎয়ের বাবার স্বপ্ন, তানিয়ার চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা সুমির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অর্জন করা সাফল্য থেমে না যায়। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এই তিন মেধাবী শিক্ষার্থী একদিন নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করে পরিবার, বিদ্যালয় ও এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ বর্ণমালা ৭১
Theme Customized By Shakil IT Park